প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ১১:৫০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
নরসুন্দা
নদীর শান্ত স্রোতের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক বিস্ময়—কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদ। দিনের আলোয়
সুউচ্চ মিনার যেমন দূর থেকে পথিকের দৃষ্টি কাড়ে, তেমনি রাত নামলেই রঙিন আলোর ঝলকানিতে
মসজিদটি যেন রূপ নেয় এক স্বপ্নিল দৃশ্যে। এটি শুধু একটি মসজিদ নয়, এটি মানুষের বিশ্বাস,
আশা আর দানের সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি।
আজ যে পাগলা মসজিদ দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত, একসময় তার চেহারা ছিল একেবারেই সাধারণ। টিনের চালা আর বেড়ার সেই ছোট্ট স্থাপনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দানে রূপ নিয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট সুদৃশ্য মসজিদে। বর্তমানে প্রায় ৫ দশমিক ৫ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই স্থাপনায় রয়েছে প্রশস্ত নামাজের জায়গা, ১২০ ফুট উঁচু মিনার, তিনটি বিশাল গম্বুজ, নদীর পাড়ে ঘাটশেড, খোলা মাঠ ও মনোরম পরিবেশ।
বিশ্বাসের
টানে ছুটে আসে মানুষ
পাগলা
মসজিদকে ঘিরে আছে এক গভীর বিশ্বাস। লোকমুখে প্রচলিত—খাঁটি নিয়তে এখানে দান করলে মনের আশা
পূরণ হয়। সেই বিশ্বাসের টানেই প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন।
কেউ আসেন মানত পূরণ করতে, কেউ আসেন অজানা এক শান্তির খোঁজে। শুধু মুসলমান নয়, নানা
ধর্মের মানুষও এখানে দান করে থাকেন। টাকা-পয়সার পাশাপাশি দান করা হয় স্বর্ণালংকার,
বৈদেশিক মুদ্রা, এমনকি গবাদিপশুও।
সিন্দুক খুললেই বিস্ময়
পাগলা
মসজিদের দান সিন্দুক খোলার দিন যেন আলাদা এক উৎসব। তিন থেকে চার মাস পরপর সেই দিন আসে,
যেদিন সিন্দুক থেকে বের হয় বস্তাভর্তি টাকা। শত শত মানুষের উপস্থিতিতে দিনভর চলে টাকা
গণনা। ব্যাংক কর্মকর্তা, প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, মসজিদের কর্মচারী—সবার
সম্মিলিত তদারকিতে চলে এই কাজ।
সর্বশেষ
সিন্দুক খোলার দিনে পাওয়া গেছে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ—১২ কোটির বেশি টাকা। মসজিদের ব্যাংক
হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণ ইতোমধ্যে ছাড়িয়েছে শত কোটি টাকার ঘর। এই বিপুল দানই পাগলা
মসজিদকে দিয়েছে এক অনন্য পরিচয়।
ইতিহাসের
আড়ালে জনশ্রুতি
পাগলা
মসজিদের জন্মকথা লিখিত ইতিহাসে স্পষ্ট নয়, তবে জনশ্রুতি রয়েছে বহু। একটি কাহিনিতে বলা
হয়, এক আধ্যাত্মিক সাধক একদিন নরসুন্দা নদীর প্রবল স্রোতের মধ্যে মাদুরে ভেসে আসেন।
আশ্চর্যজনকভাবে সেখানে চর জেগে ওঠে। অল্প সময়েই তাঁর সাধনা ও গুণকথা চারদিকে ছড়িয়ে
পড়ে। শিষ্যরা সেখানে গড়ে তোলেন হুজরা, আর সাধকের ইন্তেকালের পর সেই স্থানেই তাঁকে সমাহিত
করা হয়। পরে ওই স্থানেই নির্মিত হয় মসজিদ।
আরেক জনশ্রুতিতে উঠে আসে ‘পাগলা বিবি’র নাম। বলা হয়, স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি নরসুন্দা নদীর তীরে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তাঁর নামানুসারেই মসজিদটি পরিচিতি পায় পাগলা মসজিদ নামে। সত্য-মিথ্যার সীমা ছাড়িয়ে এসব কাহিনি আজ মসজিদের ঐতিহ্যের অংশ।
দান
থেকে মানবকল্যাণ
পাগলা
মসজিদের দানের অর্থ শুধু স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়। মসজিদসংলগ্ন নূরুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসায়
পড়াশোনা করছে প্রায় ১৩০ জন এতিম শিশু। তাদের থাকা-খাওয়া, শিক্ষা—সবই
চলে এই দানের টাকায়। পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং অসহায় ও
জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের সহায়তায়ও ব্যয় করা হয় এই অর্থের লভ্যাংশ।
স্বপ্নের
ইসলামিক কমপ্লেক্স
মানুষের
দানে ভর করে এবার আরও বড় স্বপ্ন দেখছে পাগলা মসজিদ কর্তৃপক্ষ। পরিকল্পনা রয়েছে আধুনিক
ইসলামিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার। ১০ তলা বিশিষ্ট মাল্টিপারপাস এই ভবনে একসঙ্গে প্রায় ৫০
হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে। নারীদের জন্য থাকবে আলাদা নামাজের স্থান।
সঙ্গে থাকবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, লাইব্রেরি, আইটি সেকশন ও নানা সামাজিক কার্যক্রম।
বিশ্বাস
আর দানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পাগলা মসজিদ আজ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়—এটি
মানবিকতার এক জীবন্ত নিদর্শন। নরসুন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ যেন নীরবে
বলে যায়, মানুষের বিশ্বাস আর সদিচ্ছা একসঙ্গে হলে বিস্ময় গড়া সম্ভব।
এসবিএন
1
2
3
4
5
6
7
8
9
10
1
2
3
4
5
6
7
8
9
10